Investment Opportunities and alternatives - Blog Banner

ব্যক্তিগত অর্থায়ন ও বিনিয়োগযোগ্য খাতসমূহ

AvatarPosted by

ব্যক্তিগত অর্থায়ন বলতে একজন ব্যক্তির নিজস্ব অর্থ এবং আর্থিক কার্যাবলীর ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনাকে বোঝায় যেমন, ব্যক্তিগত আয়, ব্যয়, সঞ্চয়, বিনিয়োগ ইত্যাদি। অর্থায়ন বলতে সাধারণত একটি কোম্পানির

আয়-ব্যয়, ক্রয়-বিক্রয়, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ইত্যাদি বোঝায় কিন্তু তা এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তিগত অর্থায়ন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যার মূল বিষয় ব্যক্তিগত আর্থিক উন্নয়ন, দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো, সঞ্চয় তৈরি, স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ, পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা ইত্যাদি।

মানুষ তার আর্থিক উন্নয়নের জন্য তার উপার্জিত অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের চেষ্টা করেন। কিন্তু বিনিয়োগের আগে সেই খাতগুলো লাভজনক ও নিরাপদ কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যেকোনো ব্যক্তি তার কষ্টে অর্জিত অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নানা রকম দুশ্চিন্তায় ভোগেন। কারণ এতে শুধু মুনাফা নয়, নানা রকম ঝুঁকিও সম্পৃক্ত থাকে। একজন সফল বিনিয়োগকারী হওয়ার জন্য কোন শেয়ারে বা বন্ডে বিনিয়োগ করছেন তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটি সফল বিনিয়োগ নির্ভর করে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর উপরঃ

  • একাধিক খাতে বিনিয়োগ – নগদ অর্থ, শেয়ার, বন্ড ইত্যাদিয়ের মিশ্রণের মাধ্যমে পোর্টফলিও তৈরি করা।
  • একটি নির্দিষ্ট বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি করা এবং তাতে দৃঢ়বদ্ধ থাকা, এতে করে আপনি অপ্রত্যাশিত আকস্মিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে পারবেন।
  • সেসকল বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকা যেগুলোতে প্রতারণা বা জালিয়াতির সম্ভাবনা আছে।

ব্যক্তিগত অর্থ নিরাপদে বিনিয়োগযোগ্য কিছু উল্লেখযোগ্য খাত হলঃ

স্টক

stock market instruments Equity or Stock

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হল স্টক। একটি কোম্পানির স্টক ক্রয়ের মাধ্যমে আপনি ঐ কোম্পানির শেয়ারের মালিকানা পাবেন। যে পরিমাণ স্টক ক্রয়ে করবেন আপনাকে সেই পরিমান শেয়ারের মালিকানা দেওয়া হবে। এর ফলে আপনি আপনার ক্রয়কৃত শেয়ারের পরিমাণ কোম্পানির মুনাফা ভোগ করতে পারবেন। স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে স্টক ক্রয় বিক্রয় করা হয়। স্টক এক্সচেঞ্জ বা শেয়ার বাজারের লেনদেনগুলো সরকারকর্তৃক অনুমোদিত নিয়মনীতি এর অধীনে সম্পাদন করা হয় যা একজন বিনিয়োগকারীকে বিভিন্ন প্রকার প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করে।

একটি কোম্পানি ব্যবসায় পরিচালনার জন্য মূলধন সংগ্রহের উদ্দেশ্যে স্টক বিক্রয় করে থাকে। এই স্টক ক্রয়ের মাধ্যমে আপনি ঐ কোম্পানির একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শেয়ারের মালিকানা লাভ করেন এবং কোম্পানিটির মুনাফার একটি অংশ ভোগ করতে পারেন। অর্থাৎ, যদি কোনো কোম্পানি এর ১০০০টি শেয়ার থাকে এবং একজন ব্যক্তি তার মধ্যে ১০০ টি শেয়ার ক্রয় করেন তবে তিনি কোম্পানিটির অর্জিত মুনাফার ১০% দাবি করতে পারবেন।

শেয়ার আয়ের পাশাপাশি স্টকে বিনিয়োগের আরও কিছু সুবিধা রয়েছে। যদি আপনি কোনো কোম্পানির অধিকাংশ শেয়ারের মালিক হন তবে কোম্পানির পক্ষ থেকে আপনাকে একটি ভোটাধিকার দেওয়া হয় যার সাহায্যে আপনি পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এছাড়াও কোম্পানির অর্জিত মুনাফার লভ্যাংশও শেয়ার হোল্ডাররা লাভ করে থাকেন।

স্টক প্রধানত দুই প্রকার, সাধারণ স্টক ও অগ্রাধিকার স্টক। সাধারণ স্টকে শেয়ার হোল্ডারদের ভোটাধিকার ও লভ্যাংশ প্রদান করা হয়। অগ্রাধিকার স্টক ভোটাধিকার প্রদান করে না। তবে সাধারণ শেয়ার হোল্ডারদের থেকে অগ্রাধিকার স্টক মালিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সময়ে অগ্রাধিকার শেয়ার হোল্ডারদেরকে সাধারণ শেয়ার হোল্ডারদের পূর্বে লভ্যাংশ প্রদান করা হয়ে থাকে।

বন্ড

bond-bonds-debenture-stocks-stock-concept-business-bank-banking-bill-blocks-cash-coins-currency-debt_t20_jROWvj

বন্ড হল একটি নির্দিষ্ট আয়ের উৎস যাতে বিনিয়োগকারী ঋণগ্রহীতাকে (সাধারণত সরকার বা কোন কোম্পানিকে) একটি নির্দিষ্ট হারে ঋণ প্রদান করে থাকেন। শেয়ারের মত বন্ড আপনাকে কোম্পানির শেয়ারের মালিকানা দেয় না। এটি শুধুই বিনিয়োগকারী কর্তৃক ঋণগ্রহীতাকে প্রদত্ত একটি ঋণ।  বন্ড সাধারণত সরকার, মিউনিসিপালিটি বা কোম্পানি কর্তৃক ইস্যু করা হয়ে থাকে। বন্ডের বাজার মূল্য সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় যার ফলে ক্রেতাদের মধ্যে বন্ডের আকর্ষণীয়তার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। দীর্ঘমেয়াদী বন্ডগুলোতে কম হারে সুদ প্রদান করা হয়, অপরদিকে স্বল্পমেয়াদী বন্ডগুলোতে অধিক হারে সুদ প্রদান করা হয়।

সাধারণত একটি কোম্পানি মূলধন সংগ্রহ, পরিচালনা কার্যক্রম, ঋণ পরিশোধ ইত্যাদি কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য বিনিয়োগকারীদের নিকট সরাসরি বন্ড ইস্যু করে থাকে। ইস্যুকারীর এ বন্ডে ঋণের শর্তাবলী, সুদের হার,পরিশোধিত সুদের পরিমাণ, ম্যাচুরিটির তারিখ ইত্যাদি উল্লেখ থাকে। যে হারে বন্ড হোল্ডারকে ঋণ পরিশোধ করা হয় তাকে কুপন সুদের হার বলা হয়। অধিকাংশ বন্ডই ইস্যু করার পর তা পুনরায় বিক্রয়যোগ্য। অর্থাৎ বন্ড হোল্ডারকারী চাইলে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই বন্ডের মালিকানা হস্তান্তর করতে পারেন। ক্রেতার দৃষ্টিকোণ থেকে বন্ড একটি নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ খাত কারণ এটি মেয়াদপূর্তিতে আসলের পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদ প্রাপ্তির গ্যারান্টি দেয়।

বন্ড ও স্টকের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। স্টক আপনাকে একটি কোম্পানির ইক্যুইটি প্রদান করে। এটি আপনাকে কোম্পানির শেয়ারের মালিকানা দেয় যার ফলে আপনি মুনাফার উপর লভ্যাংশ ভোগ করতে পারেন। কোম্পানির প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে আপনারও আর্থিক প্রবৃদ্ধি পাবে, একইভাবে কোম্পানি ক্ষতির সম্মুখীন হলে আয়ের পরিমাণ হ্রাস পাবে। অপরদিকে, বন্ড শুধুই বিনিয়োগকারীর জন্য একটি কোম্পানিকে প্রদত্ত ঋণ যা হতে আপনি মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর আসল ফেরতের পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট হারে সুদ গ্রহণ করতে পারবেন। অর্থাৎ স্টকে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও আয়ের দিক থেকে এটি বেশি আকর্ষণীয় যেখানে বন্ডের আয়ের হার নির্দিষ্ট এবং ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। তাই যেসকল বিনিয়োগকারী বিভিন্ন শিল্পখাত ও বাজার অবস্থা যাচাই করে অধিক ঝুঁকি নিয়ে অধিক মুনাফা লাভ করতে ইচ্ছুক তারা বন্ডের তুলনায় স্টকে বিনিয়োগ করে বেশি লাভবান হতে পারেন।

মিউচুয়াল ফান্ড

a-mutual-fund-is-managed-by-a-professional-portfolio-manager-that-purchases-securities-with-money_t20_VWdj2b

মিউচুয়াল ফান্ড হল পেশাদার ফান্ড ম্যানেজারদের কর্তৃক পরিচালিত একটি ফান্ড যা একাধিক বিনিয়োগকারী হতে মূলধন সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে এই সংগৃহীত অর্থ ইক্যুইটি, বন্ড, সিকিউরিটি ইত্যাদি পোর্টফলিওতে বিনিয়োগ করা হয়। মিউচুয়াল ফান্ড স্বল্প মূলধণের বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন রকম পোর্টফলিওতে কম খরচে বিনিয়োগ করার সুযোগ প্রদান করে। মিউচুয়াল ফান্ডের ভ্যালু কোন সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে তার পারফর্মেন্সের উপর নির্ভর করে।

অর্থাৎ, আপনি যদি একটি মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার ক্রয় করেন তবে আপনি ঐ পোর্টফলিও এর পারফর্মেন্সের একটি অংশ ক্রয় করছেন। মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার ক্রয় করা এবং একটি সাধারন শেয়ার ক্রয় করা এক নয়। সাধারণ শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে কোম্পানির যে ভোটাধিকার পাওয়া যায় তা মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে পাওয়া যায় না।

একজন বিনিয়োগকারী ৩ ভাবে মিউচুয়াল ফান্ড থেকে আয় করতে পারেনঃ

১। পোর্টফলিওয়ের অন্তর্ভুক্ত স্টক এর লভ্যাংশ অথবা বন্ডের সুদ হতে আয় করতে পারেন। সাধারণত ফান্ডের সিকিউরিটি হতে প্রাপ্ত সকল আয় বছর শেষে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। এটি বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্ত আয়ের জন্য চেক প্রদানের পাশাপাশি প্রাপ্ত মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগের সুযোগও দিয়ে থাকে।

২। সময়ের সাথে কিছু সিকিউরিটিয়ের মূল্য বৃদ্ধি পায়। সেগুলো বিক্রয়ের মাধ্যমে ফান্ডটি মূলধন অর্জন করে থাকে। এই মূলধন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়।

৩। ফান্ডের সিকিউরিটিগুলোর মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার পর যদি ফান্ড ম্যানেজার সেই সিকিউরিটিগুলো বিক্রয় না করে তবে ফান্ডের শেয়ার মূল্য বৃদ্ধি পায়। একজন বিনিয়োগকারী তার মিউচুয়াল ফান্ডের এই শেয়ার পুনরায় বিক্রয় করে মুনাফা লাভ করতে পারেন।

একটি মিউচুয়াল ফান্ড তার বিনিয়োগকারীদের নিকট হতে দুই ধরণের ফি ধার্য করে, পরিচালন ফি এবং শেয়ার হোল্ডারের ফি। পরিচালন ফি সাধারণত বার্ষিক পরিচালন তহবিলের ১%-৩% হয়ে থাকে। এই পরিচালন ফি মূলত ব্যবস্থাপনা ফি এবং প্রশাসনিক ফি এর সমষ্টি।

স্থায়ী সম্পত্তি

Fixed asset

স্থায়ী সম্পত্তিতে বিনিয়োগ আয়ের একটি অন্যতম দ্রুততম মাধ্যম। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ যা থেকে বিনিয়োগকারী নিয়মিত নগদ অর্থ উপার্জন করতে পারেন। এতে বিনিয়োগের জন্য অধিক মূলধনের প্রয়োজন হয় না। একজন বিনিয়োগকারী লেভারেজের মাধ্যমে মোট ব্যয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ পরিশোধ করে সময়ের সাথে সুদসহ সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করে সম্পত্তি ক্রয় করতে পারেন। সাধারনত বন্ধকী ঋণ বা মর্টগেজের মাধ্যমে ক্রয়ের ক্ষেত্রে ২০%-২৫% ডাউন পেমেন্ট পরিশোধ করেই সম্পত্তির মালিকানা লাভ করা যায়। একজন বিনিয়োগকারী স্থায়ী সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করে বিভিন্ন রকম আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন। যেমন-

  • লেভারেজের মাধ্যমে সম্পত্তি ক্রয় করে
  • ভাড়াযোগ্য সম্পত্তি ক্রয় করে ভাড়া প্রদানের মাধ্যমে, যেমন, বাড়ি, গাড়ি, যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ইত্যাদি
  • অবমূল্যায়িত সম্পত্তি কম মূল্যে ক্রয়ে করে, সেটিকে মেরামতের মাধ্যমে বা আধুনিকায়ন করে অধিক মূল্যে বিক্রয় করে

এছাড়াও, সময়ের সাথে সাথে মুদ্রাস্ফীতিয়ের কারণে স্থায়ী সম্পদের মূল্য বৃদ্ধি পায় যা আপনার আর্থিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

আপনার সঞ্চিত অর্থ স্টক, বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, স্থায়ী সম্পদ যেখানেই বিনিয়োগ করুন না কেন, লক্ষ্য রাখতে হবে যেন আপনার অর্থ একটি বিশ্বাসযোগ্য ও লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে কিনা। আর এজন্য আর্থিক বাজার, কোম্পানি সম্পর্কে যাবতীয় প্রয়োজনীয় তথ্য ইত্যাদি জেনে বিবেচনা ও বিচক্ষনতার সাথে সিধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এতে করে অনাকাঙ্ক্ষিত আর্থিক ক্ষতি ও যেকোনো রকম প্রতারণা থেকে বিরত থেকে নিজের আর্থিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সম্ভব।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply