ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগ এর সর্বপ্রথম ধাপ হলো নিজের একটি বিও অ্যাকাউন্ট খোলা। বিও অ্যাকাউন্ট একটি হিসাব নম্বর যার মাধ্যমে আপনি বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে লেনদেন করতে পারবেন। একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যেরকম আপনার টাকার হিসাব থাকে, একটি বিও অ্যাকাউন্ট ঠিক সেরকম আপনার শেয়ারের হিসাব থাকে। একজন বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে তার যাত্রা শুরু করবে  বিও অ্যাকাউন্ট খোলার মাধ্যমে। আপনি জেনে আনন্দিত হবেন যে, এখন অনলাইনে বিও অ্যাকাউন্ট খোলা একদম সহজ। তবে  সঠিক উপায় বিনিয়োগ করতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে  বিও অ্যাকাউন্ট খোলার আগে কিছু বিষয় অবশ্যই জানা দরকার।  আজকের লেখনীতে আমরা তুলে ধরব অনলাইনে বিও হিসাব খোলার জন্য যা কি কি বিষয়জানা দরকার।

পরিকল্পনা করা

আমরা মনে করি একজন বিনিয়োগকারী একটি বিও অ্যাকাউন্ট খোলার আগে অবশ্যই পরিকল্পনা করে নিবেন কেন তিনি অ্যাকাউন্ট খুলতে চান।  পরিকল্পনা ছাড়া সিদ্ধান্ত মাঝিবিহীন নৌকার মত,  তাই যেকোনো ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে অবশ্যই পরিকল্পনা করে নেয়া প্রয়োজন।  অনলাইনে বিও অ্যাকাউন্ট খোলার আগে আপনার অবশ্যই জানা থাকতে হবে আপনি কেন অ্যাকাউন্ট খুলতে চাচ্ছেন।  আপনার পরিকল্পনার উপর আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ গুলো নির্ভর করবে।  সুতরাং অনলাইনে বিও হিসাব খোলার জন্য সবার প্রথমে আপনার একটি পরিপূর্ণ পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।  আপনার পরিকল্পনা যত ভালো এবং নিখুঁত হবে আপনার কাজের ধরন ও তার প্রতিফলন ধরে রাখবে।  সঠিকভাবে পরিকল্পনা করতে পারলে তা অদূর ভবিষ্যতে ঝুঁকিকে সাধ্যের মধ্যে রাখতে সাহায্য করবে। এখন হয়তো আপনি ভাবছেন এই পরিকল্পনায় কি কি বিষয় নির্ধারণ করতে হবে,  আসুন দেখে নেয়া যাক।

ব্রোকার হাউজ

বাংলাদেশের শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারী হিসেবে সংযুক্ত হতে হলে আপনাকে অবশ্যই কোন না কোন ব্রোকার হাউজ এর আওতাধীন হয়ে কাজ করতে হবে। কোন ব্রোকার হাউজের রেজিস্ট্রেশন করার আগে আপনি অবশ্যই তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড,  বাজারে তাদের সুনাম,  ক্লায়েন্টের  পরিমাণ এবং তারা আপনার প্রয়োজনীয়তা গুলো পূরণ করতে পারছে কিনা সেটা যাচাই করে নিবেন।একজন বিনিয়োগকারী হিসেবে সফল হতে হলে আপনাকে অবশ্যই একটি পরিপূর্ণ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ  ব্রোকার হাউজ  এর সাথে কাজ করতে হবে সেক্ষেত্রে একটি ব্রোকার হাউজ আপনাকে কি কি সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে সেটি অবশ্যই যাচাই করে নিবেন। অন্যথায় বিনিয়োগ করে নেমে গেলে মাঝপথে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অন্য ব্রোকার হাউজের শরণাপন্ন হওয়া আপনার জন্য কঠিন হতে পারে।

অ্যাকাউন্টের ধরন

যখন আপনার পরিকল্পনা হয়ে গিয়েছে  এবং আপনি ঠিক করে ফেলেছেন কোন ব্রোকার হাউজের মাধ্যমে আপনি অনলাইনে বিও হিসাব খুলতে চান তখন আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে পরবর্তী পদক্ষেপ গুলো নিয়ে।  এর প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে আপনি কোন ধরনের বিও হিসাব খুলতে চান সেটা নির্ধারণ করা। অনলাইন বিও হিসাব সাধারনত দুই ধরনের হয়ে থাকে।  ইন্ডিভিজুয়াল অ্যাকাউন্ট এবং জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট। ইন্ডিভিজুয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে একজন ব্যক্তি শেয়ার কেনাবেচা করতে পারবেন। জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে দুইজন ব্যক্তি শেয়ার কেনাবেচা করতে পারবেন।  অনলাইনে বিও হিসাব খোলার জন্য আপনার আগে থেকেই ঠিক করে রাখতে হবে আপনি কি ধরনের অ্যাকাউন্ট  খুলতে চান।   তবে এটা মনে রাখা প্রয়োজন অ্যাকাউন্টের ধরনের ওপর অ্যাকাউন্টের পারফর্মেন্স নির্ভর করে না।  এটি শুধু একটি কাজের প্রক্রিয়া মাত্র।   অর্থাৎ বিও অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ইন্ডিভিজুয়াল অ্যাকাউন্ট এবং জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট এর মাঝে কার্যকারিতার দিক থেকে কোন পার্থক্য নেই।

 অ্যাকাউন্ট খোলার উপায়

অনলাইনে বিও হিসাব খোলার  একটি অন্যতম বিষয় হচ্ছে আপনাকে জানতে হবে আপনি কোথায় গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে চান।  সেক্ষেত্রে আপনাকে সাধারণত একটি ব্রোকার হাউজ এর মাধ্যমেই বিও হিসাব খুলতে হবে। উপরের ধাপগুলো অনুসরণ করে যখন আপনি একটি ভাল ব্রোকার হাউজ পেয়ে গিয়েছেন তখন তাদের অ্যাকাউন্ট খোলার উপায় সম্পর্কে নিজেকে অবগত করুন।

তার পাশাপাশি অনলাইনে বিও হিসাব খোলার জন্য যে সকল কাজ করা প্রয়োজন সেগুলো ধীরে ধীরে সম্পন্ন করতে থাকুন।  সাধারণত অনলাইনে বিও হিসাব খুলতে আপনার যেসকল মৌলিক জিনিসগুলোর প্রয়োজন হবে তা হলঃ

  • ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
  • জাতীয় পরিচয় পত্র এর দুই পাশের এর স্ক্যান কপি
  • পাসপোর্ট সাইজ ছবি
  • নমিনির জাতীয় পরিচয় পত্র এর দুই পাশের এর স্ক্যান কপি
  • নমিনির ছবি
  • সিগনেচার এর স্ক্যান

যেকোনো ব্রোকার হাউজের মাধ্যমে অনলাইনে বিও হিসাব খোলার জন্য উপরোক্ত ডকুমেন্ট এবং তথ্যগুলো প্রয়োজন হয়ে থাকে।  আপনি আপনার মত করে সকল পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করে অনলাইনে বিও হিসাব খোলার জন্য আগাতে পারবেন।  তবে উল্লেখ্য যে ব্রোকার হাউজের এর উপর ভিত্তি করে মাঝে মাঝে কিছু অতিরিক্ত ডকুমেন্ট এবং তথ্যের প্রয়োজন হতে পারে।

 ফিনান্সিয়াল লিটারেসি

অনলাইনে বিও হিসাব খোলার জন্য ফিনান্সিয়াল লিটারেসি অনেক বেশি প্রয়োজন।  ফিনান্সিয়াল লিটারেসি বলতে আমরা বুঝি কোন একটি বিষয় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা যাতে করে আপনি সেই বিষয়টি পরিচালনা করতে পারেন। অর্থাৎ শেয়ারবাজার অনলাইন বিও হিসাব খুলে  বিনিয়োগ করার সার্বিক বিষয় সম্পর্কে আপনার সাধারন জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।  তার পাশাপাশি শেয়ার বাজার কিভাবে কাজ করে এবং এর সম্পর্কে একটি মৌলিক ধারণা রাখা দরকার।  অন্যথায় সঠিক সিদ্ধান্তের অভাব এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে আপনার উদ্যোগটি বিফলে যেতে পারে।

নিজের চেষ্টায় অথবা অভিজ্ঞদের সহায়তা আপনি শেয়ার বাজার সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করার চেষ্টা করবেন।  তাতে করে আপনার শেয়ার বাজারের যাত্রা সহজ হবে এবং নানান ধরনের ঝুঁকি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা  সম্ভবপর হবে।

কমন কিছু প্রশ্ন

অনলাইনে বিও হিসাব খোলা নিয়ে অনেকের মনেই থাকে নানান রকম প্রশ্ন। আসুন জেনে নেই কমন কিছু প্রশ্ন এবং তার উত্তর।

১। একজন ব্যক্তি কয়টি বিও অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন?

উত্তরঃ একজন ব্যক্তি ২টি বিও হিসাব খুলতে পারবেন। একটি ইন্ডিভিজুয়াল অ্যাকাউন্ট এবং আরেকটি জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট।

২। নমিনি কে হতে পারবে?

নমিনি হওয়ার জন্যে আলাদা কোন শর্ত নেই। আঠারো বছরের উপরে যে কেউ নমিনি হতে পারবে। যদি নমিনি ১৮ বছরের কম হয়, সেক্ষেত্রে গার্ডিয়ান এর তথ্য প্রদান করতে হবে। এবং প্রয়োজনে ২ জন ব্যক্তিকেও নমিনি হিসেবে মনোনীত করা সম্ভব।

৩। নমিনি এর জন্যে কি কি ডকুমেন্ট প্রয়োজন?

  • সম্প্রতি তোলা পাসপোর্ট সাইজ ছবি
  • জাতীয় পরিচয় পত্র/পাসপোর্ট/ড্রাইভিং লাইসেন্স এর স্ক্যান কপি
  • নমিনি এর সিগনেচার এর স্ক্যান কপি

৪। পাওয়ার অব এটর্নি কি?

পাওয়ার অব এটর্নি অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের মনোনীত ব্যক্তি যিনি অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করার অধিকার রাখে। অ্যাকাউন্ট হোল্ডার যেকোন সময় পাওয়ার অব এটর্নি পরিবর্তন করতে পারেন।

৫। বিও অ্যাকাউন্ট খুলতে কত সময় লাগে?

আমাদের মাধ্যমে বিও অ্যাকাউন্ট খুলতে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন।

৬। বিও অ্যাকাউন্ট খুলতে কত টাকা খরচ হয়?

অনলাইনে বিও হিসাব খুলে ৪৫০ টাকা প্রয়োজন। এবং তা SSL পেমেন্ট গেটওয়ে এর সহায়তায় মোবাইল ব্যাংকিং, কার্ড এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং এর মাধ্যমে ফি পরিশোধ করতে পারবেন।

অনলাইনে বিও হিসাব খোলার জন্য সাধারণত উপরের  বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা প্রয়োজন।  এ বিষয়গুলো নিয়ে সঠিক জ্ঞান রাখেন এবং উল্লেখিত পদক্ষেপগুলো পালন করার মাধ্যমে খুব সহজে যে কেউ অনলাইনে বিও হিসাব খোলার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারেন।  তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে কোন পদক্ষেপ নেয়ার পূর্বে অবশ্যই তার সবগুলো বিষয় সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া দরকার।  তার ক্ষেত্রে যদি  কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে পরামর্শ প্রয়োজন হয় তা গ্রহণ করতে হবে।  আশা করি আমাদের এই লেখনীর মাধ্যমে আপনি বুঝতে পেরেছেন অনলাইনে বিও হিসাব খোলার জন্য কোন কোন বিষয়গুলো জানা প্রয়োজন।