মিউচুয়াল ফান্ড একাধিক বিনিয়োগকারী থেকে অর্থ সংগ্রহ করে শেয়ার, বন্ড ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগ করে একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ পোর্টফলিও তৈরি করে যা একজন সাধারণ বিনিয়োগকারীর একার পক্ষে কষ্টকর। এটি বিনিয়োগকারীদের পক্ষ হতে পেশাদার ও অভিজ্ঞ ম্যানেজার কর্তৃক পরিচালনা করা হয়। মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীরা সেসকল কোম্পানির শেয়ারের মালিকানা লাভ করেন যাদের মূল উদ্দেশ্য হল অন্যান্য কোম্পানির শেয়ার, বন্ড, সরকারি বন্ড বা অন্যান্য সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ করা। মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীরা ফান্ড ম্যানেজারদের কর্তৃক ক্রয়কৃত শেয়ার বা বন্ডের সরাসরি মালিকানা লাভ করেন না। তারা শুধুমাত্র ফান্ডটিতে তাদের বিনিয়োগকৃত শেয়ারের মালিকানা পান এবং তা থেকে প্রাপ্ত লাভ বা ক্ষতি ভোগ করেন। বিনিয়োগকারীরা এসকল মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করবেন কিনা তা ফান্ড ম্যানেজারকর্তৃক বিনিয়োগকৃত সিকিউরিটিগুলোর পারফর্মেন্সের  উপর ভিত্তি করে বিবেচনা করেন। দিনশেষে সকল সিকিউরিটির মূল্য বিবেচনায় এনে মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার ভ্যালু মূল্যায়ন করা হয়। একারণে মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার প্রতি মূল্যকে নিট এসেট ভ্যালু (NAV) বলা হয়।

মিউচুয়াল ফান্ডে কেন বিনিয়োগ করব

মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে একজন বিনিয়োগকারী নানা রকম সুবিধা পেতে পারেন। প্রথমত, মিউচুয়াল ফান্ড পেশাদার ম্যানেজারদের কর্তৃক পরিচালনা করা হয়। ম্যানেজাররা এসকল ফান্ডের শেয়ার নির্ধারণ ও এর পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করেন। দ্বিতীয়ত, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে একজন বিনিয়োগকারী একাধিক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে একটি লাভজনক পোর্টফলিও তৈরি করতে পারেন যা বিনিয়োগে ঝুঁকির পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। তৃতীয়ত, এতে প্রাথমিক বিনিয়োগের পরিমাণ কম। ফলে সকল বিনিয়োগকারীই এতে সহজে বিনিয়োগ করতে পারেন। এছাড়াও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার যেকোনো সময়ে খুব সহজেই তারল্যে পরিবর্তন করা যায়। তাই নগদ অর্থের প্রয়োজনে মিউচুয়াল ফান্ড খুব সহজেই বিনিয়োগকারীদের তারল্য সমস্যার সমাধান করে থাকে।

why invest in mutual fund

মিউচুয়াল ফান্ড হতে আয়

মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে এক বিনিয়োগকারীর আয় প্রবৃদ্ধি তিনটি উৎস থেকে হতে পারে:

লভ্যাংশ আয়

যখন একটি ফান্ড তার পোর্টফলিও এর সিকিউরিটিগুলো থেকে লভ্যাংশ বা সুদ পায় তখন তা সকল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট হারে বণ্টন করে দেয়া হয়। বিনিয়োগকারী তার এই আয় সরাসরি গ্রহণ করতে পারেন অথবা ফান্ডে পুনরায় বিনিয়োগ করতে পারেন।

মূলধন আয়

যখন ফান্ডের অন্তর্ভুক্ত কোন সিকিউরটির মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং ফান্ডটি তা বিক্রয় করে তখন তা হতে প্রাপ্ত আয়কে মূলধন আয় বলা হয়। একইভাবে সিকিউরিটির মূল্য হ্রাস পাওয়ার পর তা বিক্রয় করা হলে তাকে মূলধন ব্যয় বলা হয়। ফান্ড ম্যনেজারগণ এসকম মূলধন আয়/ব্যয় বছরের শেষে বিনিয়োগকারীদের বণ্টন করে থাকেন।

নিট এসেট ভ্যালু (NAV)

ফান্ডের ভ্যালু যত বৃদ্ধি পায়, ফান্ডের শেয়ার প্রতি ক্রয়মুল্য তত বৃদ্ধি পায় যা নিট এসেট ভ্যালু নামে পরিচিত। এটা অনেকটা শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার মত। আপনি তাৎক্ষনিকভাবে এর মুনাফা ভোগ করতে না পারলেও আপনার বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় যা আপনি পুনরায় বিনিয়োগ করতে পারেন বা বিক্রয় করতে পারেন।

মিউচুয়াল ফান্ডে বিদ্যমান ঝুঁকিসমূহ

সকল বিনিয়োগেই ঝুঁকি বিদ্যমান এবং মিউচুয়াল ফান্ড এর ব্যতিক্রম নয়। মিউচুয়াল ফান্ডের অন্তর্গত সিকিউরিটিয়ের মূল্য কখনো কখনো হ্রাস পেতে পারে যার। এর ফলে বিনিয়োগকারী তার বিনিয়োজিত অর্থের কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ অর্থই হারাতে পারেন। আবার বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় লভ্যাংশ ও সুদের হারের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। যার ফলে বিনিয়োগকারীর আয়ের হার হ্রাস পেতে পারে। তা স্বত্বেও, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ শেয়ারে বিনিয়োগের থেকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ।

মিউচুয়াল ফান্ড ক্রয়ের ধাপসমূহ

মিউচুয়াল ফান্ড ক্রয়ের ক্ষেত্রে একজন বিনিয়োগকারীকে পাঁচটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে। এই ধাপগুলো নিম্মে উল্লেখ করা হল:

ধাপ : বিনিয়োগের শুরুতেই আপনার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করুন

বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত দুই ধরণের কৌশল অবলম্বন করে থাকেন, একটিভ পোর্টফলিও ম্যানেজমেন্ট এবং প্যাসিভ পোর্টফলিও ম্যানেজমেন্ট। একটিভ পোর্টফলিও ম্যানেজমেন্ট এর লক্ষ্য হল বাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন বেঞ্চমার্ক ও ইনডেক্স তৈরি করা। এতে ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। অপরদিকে প্যাসিভ পোর্টফলিও ম্যানেজমেন্ট বাজারে বিদ্যমান বেঞ্চমার্ক ও ইনডেক্সগুলোকে অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এতে ব্যয়ের পরিমাণ কম এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পারফর্মেন্স তুলনামূলক ভালো। বর্তমানে প্যাসিভ পোর্টফলিও ম্যানেজমেন্ট সর্বাধিক জনপ্রিয় বিনিয়োগ কৌশল।

ধাপ : আপনার বাজেটের পরিমাণ নির্ধারণ করুন

বিনিয়োগের পূর্বে অবশ্যই আপনাকে আপনার বাজেটের পরিমাণ নির্ধারণ করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে দুইটি বিষয় বিবেচ্য:

  • কী পরিমাণ বাজেট বিনিয়োগ করা হবে- মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রায়শই একটি প্রাথমিক মূলধনের প্রয়োজন হয়। আবার কিছু কিছু মিয়চুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা প্রাথমিক মূলধন ছাড়াই বিনিয়োগ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেন।
  • বাজেটটি কীভাবে বিনিয়োগ করা হবে- মিউচুয়াল ফান্ডের একটি অন্যতম সুবিধা হল এটি সর্বনিম্ন ব্যয়ে একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ পোর্টফলিও তৈরি করতে সাহায্য করে। তবে ঝুঁকি বিবেচনায় কোন পোর্টফলিওটি আপনার জন্য উৎকৃষ্ট তা বিনিয়োগের শুরুতেই নির্ধারণ করে নিতে হবে।

ধাপ : কোথা থেকে ফান্ডটি ক্রয় করা হবে

একজন বিনিয়োগকারী সরাসরি কোম্পানি থেকে ফান্ড ক্রয় করতে পারেন অথবা অনলাইনে ব্রোকারেজ ফার্ম থেকেও ক্রয় করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে চারটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে:

  • ফান্ডটি ক্রয়ের জন্য আপনার যথাযথ পরিমাণ মূলধন রয়েছে কিনা
  • কোম্পানিটিতে আপনার পছন্দমতো বেছে নেওয়ার মত একাধিক ফান্ড আছে কিনা
  • ফান্ডটি গঠনের সময়ে বিবেচ্য বিষয়গুলো পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ব্রোকারের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা
  • ওয়েবসাইট বা কোম্পানি থেকে সরাসরি ক্রয় যাই হোক না কেন সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পাদনে বিনিয়োগকারীর স্বাছন্দ্য

ধাপ : ফান্ডটির পরিচালন ব্যয়

ফান্ড পরিচালনের জন্য প্রতিটি কোম্পানিই বিনিয়োগকারীদের নিকট হতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন ও পরিচালন ব্যয় ধার্য করে। এক্ষেত্রে আপনার ফান্ডটির সার্ভিস লেভেল যত বেশি হবে, কোম্পানিকর্তৃক ধার্যকৃত চার্জের পরিমাণ ততটাই বেশি হবে।

ধাপ : ফান্ডটির যথাযথ পরিচালন ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন

আপনার ফান্ডটি যথাযথভাবে পরিচালিত হবে কিনা তা বিনিয়োগের শুরুতেই নিশ্চিত করে নিতে হবে। আপনি যদি একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় অটল থাকেন তবে ফান্ডটির পারফর্মেন্সে প্রবৃদ্ধি হতে তুলনামূলক অধিক সময়ে লাগতে পারে, যা ফান্ডে বিনিয়োগকারীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। তাই যেসকল কোম্পানি প্রতি বছর শেষে ফান্ডের সিকিউরিটিগুলোর ভ্যালু, কোন সিকিউরিটিগুলো লাভজনক, কোনগুলোতে পুনরায় বিনিয়োগ করতে হবে, কোনগুলো বিক্রয় করতে হবে তা মূল্যায়ন করে সেসকল কোম্পানির ফান্ড পরিচালন ব্যবস্থা অধিক নির্ভরযোগ্য বলে গন্য করা হয়।

মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সুবিধাসমূহ

মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ খাত। বিনিয়োগকারীরা এ ফান্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে নানা রকম সুবিধা পেতে পারেন। যেমন:

  • যেহেতু ফান্ডটি পেশাদার ও অভিজ্ঞ ম্যানেজারদেরকর্তৃক পরিচালিত হয়,বিনিয়োগকারী এর পরিচালন কার্যক্রম সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। ম্যানেজারগণ সময়ে সময়ে ফান্ডের সিকিউরিটিগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করেন এবং ফান্ড হতে প্রাপ্ত মুনাফা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নির্দিষ্ট হারে বণ্টন করে দেন।
  • নূন্যতম প্রাথমিক মূলধনের জন্য যেকোনো বিনিয়োগকারী এতে খুব সহজেই বিনিয়োগ করতে পারেন।
  • মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার যেকোনো সময়ে খুব সহজেই তারল্যে পরিবর্তন করা যায়। তাই নগদ অর্থের প্রয়োজনে মিউচুয়াল ফান্ড খুব সহজেই বিনিয়োগকারীদের তারল্য সমস্যার সমাধান করে থাকে।
  • একটি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ করা হলে তাতে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। মিউচুয়াল ফান্ড একাধিক সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ করে একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ পোর্টফলিও তৈরির মাধ্যমে এই ঝুঁকি হ্রাস করতে সাহায্য করে।

প্রতিটি বিনিয়োগকারী একটি নির্ভরযোগ্য খাতে বিনিয়োগ করে তার আর্থিক উন্নয়নের চেষ্টা করে। তাই মিউচুয়াল ফান্ড প্রতিটি বিনিয়োগকারীর জন্য একটি লাভজনক ও আকর্ষণীয় বিনিয়োগ খাত। এতে ঝুঁকির পরিমাণ অন্যান্য সিকুউরিটি এর তুলনায় অনেক কম। এটি পেশাদার ম্যানেজার কর্তৃক পরিচালিত একটি ফান্ড যার মূল উদ্দেশ্য হল বিনিয়োগকারীদের সঞ্চিত অর্থ নির্ভরযোগ্য খাতে বিনিয়োগ করে সর্বোচ্চ লাভজনকতা নিশ্চিত করা।